চন্দ্রাবতীর করুন জীবন কাহিনী

145
চন্দ্রাবতীর করুন জীবন কাহিনী
চন্দ্রাবতীর করুন জীবন কাহিনী

সুপ্রিয়া বিশ্বাস

বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবি চন্দ্রাবতী ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ময়ময়সিংহ অঞ্চলের কিশোরগঞ্জের পাতুয়া গ্রামে জন্মগ্রহন করেন।পিতা মনসামঙ্গল কাব্যের রচয়িতা দ্বিজ বংশীদাস এবং মাতার নাম সুলোচনা।ষোড়শ শতকে যখন মেয়েদের এমনকি নিম্নবর্নের পুরুষেরও শিক্ষার দ্বার উম্মোচন হয়নি তখন এই অসামান্য প্রতিভাময়ী নারী বাংলা সাহিত্যে তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন।

কিন্তু এই প্রতিভাময়ী নারীর জীবনে আর দশটা নারীর মত স্বাভাবিকতায় পরিপূর্ণ ছিলনা।তাঁর ভাগ্য তাঁকে একাকী করে দেয়।তিনি যখন কৈশোরে পা দেন তখন থেকেই বাল্যকালের খেলার সঙ্গী অনাথ জয়ানন্দের প্রেমে পড়েন।চন্দ্রাবতী ও জয়ানন্দের সম্পর্ক গাঢ় হলে চন্দ্রাবতীর বাবা তাদের বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন।দিনক্ষন ঠিক হয়ে যায়।

কিন্তু জয়ানন্দের জীবনে আরেকটি ঘটনা ঘটে যায়।জয়ানন্দ তখনকার প্রভাবশালী কাজির মেয়ে আসমানীর রুপে মুগ্ধ হয়ে কয়েকটি প্রেমপত্র দেন।জয়ানন্দ আর চন্দ্রাবতীর বিয়ের দিন সব জেনেও আসমানী তার পিতার কাছে জয়ানন্দকেই বিয়ে করবে বলে জানিয়ে দেন।কাজীর লোকজন এসে জয়ানন্দকে নিয়ে যায় এবং ধর্মান্তরীত করে আসমানীর সাথে বিয়ে দিয়ে দেন।
বধুবেশে অপেক্ষারত চন্দ্রাবতী যখন একথা শোনেন তখন আবেগে মুষড়ে পড়েন।তিনি তাঁর পিতার কাছে দুইটি আবদার করেন।একটি হলো তিনি চিরকুমারী থাকবেন আর দ্বিতীয়টি হলো নির্জন ফুলেশ্বরী নদীর তীরে একটি শিবমন্দির স্হাপন করে দিতে হবে সেখানেই তিনি তপস্যা করবেন।পিতা তাতেই রাজি হন এবং একটি শিব মন্দির করে দেন।চন্দ্রাবতী এদিকে আরাধনা আর একদিকে সাহিত্য চর্চা নিয়ে সময় পার করেন।তাঁর রচিত কবিতা, গান, পালাগান, রামায়ন মানুষের মুখে মুখে ফিরতো।

কয়েকবছর পর জয়ানন্দ আবার চন্দ্রাবতীর সাথে সবকিছু ছেড়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে চায়।কিন্তু চন্দ্রাবতীর বাবা নিষেধ করেন এবং চন্দ্রাবতীও তাঁকে ফিরিয়ে দেন।একদিন সন্ধ্যায় চন্দ্রাবতী যখন প্রার্থনারত তখন জয়ানন্দ দেখা করতে এসে চন্দ্রাবতীকে না পেয়ে তাঁর দরজার সামনে চার লাইনের একটি কবিতা লিখে চলে যান।চন্দ্রাবতী প্রার্থনা শেষে কাগজটি পড়ে বুঝতে পারেন জয়ানন্দ একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।তৎক্ষনাৎ তিনি ফুলেশ্বরী নদীর তীরে ছুটে যান কিন্তু ততক্ষনে সব শেষ।

চন্দ্রাবতী সেদিন থেকে তার কবিতা লেখার সমাপ্তি টানলেন।এজন্য চন্দ্রাবতী লিখিত রামায়ন অসমাপ্ত রয়ে যায়।এভাবেই নির্জনে চন্দ্রাবতীর জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে।