খবরীর কলকাঠিতে রাজধানীতে অবিরাম মাদক ব্যবসা চলছেই

10972

নিজস্ব প্রতিবেদক

আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানের মধ্যেও ধরা ছোয়ার বাইরে রয়েছে রাজধানীর বনানী থানা আওতাভুক্ত এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীরা। অভিযানের হাত থেকে বাঁচতে এসব মাদক ব্যবসায়ীরা আত্মগোপনে চলে গেছেন। অথচ আড়াল থেকে এখনও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রন করছে গডফাদাররা। শুধু তাই নয় বনানীতে পুলিশের কিছু কর্মকর্তারও সহযোগীতা করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। যে কারনে বন্ধ হচ্ছে না মাদক ব্যবসা।

তবে আইন শৃঙ্খলা-রক্ষাকারী বাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছে, “যে যেখানেই আত্মগোপন করুক না কেন, মাদক ব্যবসায়ী যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, মাদকের গডফাদারদের খুঁজে খুঁজে বের করে ধরে আনা হবে। আইন শৃঙ্খলা-রক্ষাকারী বাহিনীর কেউ জড়িত থাকলে তাকেও ছাড় নয়।”

অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, বনানীর মাদকের ডিলার ও হোল সেলাররা মাঝে মধ্যে ধরা পড়লেও বিভিন্ন মহলের সহযোগীতায় বেরিয়ে এসে নতুন উদ্যোমে দ্বিগুন উৎসাহে শুরু করে দেয় মাদক রাজ্যের নিয়ন্ত্রন। শুধু তাই নয়, এসব মাদক মাদক ব্যবসায়ীর মধ্যে অনেকেই নিজেদের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সোর্স পরিচয় দিয়েও তাদের মাদক বানিজ্য জমিয়ে তোলে। সমাজের সচেতন মহল তাদের দাপটে থাকে অতিষ্ট। নিজেদের সম্মান রক্ষার্থে পাড়ায় মহল্লায় নিরাপদ দূরত্বে চলেন সুধীজনরা।

এ বিষয়ে বনানীর বাসিন্দা নুরু মিয়া বলেন, মাদক ব্যবসায়ীরা সঙ্গবদ্ধ দলে বিচরন করে। তাদের রুখতে গিয়ে মহল্লার অনেক সিনিয়র ভাই বিপদে পড়েছে। যারা বিচার আচার করে তারা তাদের সাথে সখ্যতা রেখে সব কাজ করেন।

অন্যদিকে, মহাখালী ওয়ারলেস গেইট টিএন্ডটি পূর্ব কোলোনির বিটিসিএলের পানির পাম্প এলাকার আব্দুর রহমান মাসুম ওরফে মোল্লা মাসুম নামে এক ব্যক্তির ইয়াবা স্পট রয়েছে। মোল্লা মাসুম ওই এলাকায় ইয়াবার মেগা ডিলার হিসেবে সরকারি তালিকাভুক্ত। তার সহযোগী বনানী থানা পুলিশ সোর্স নোয়াখালীর শহীদ। তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রসহ একাধিক মামলা রয়েছে রাজধানীর বিভিন্ন থানায়।

জানা যায়, ১৮ এপ্রিল ২০১৬ সালে দুটি পিস্তল ৬ রাউন্ড গুলিসহ র‌্যাব-১ মোল্লা মাসুমকে গ্রেফতার করেছিল। সহযোগী সোর্স শহীদকে ২০০৫ সালে পিস্তল ও বিস্ফোরকসহ বনানী ২নং রোডের হিন্দুপাড়া বস্তি থেকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-১। বনানী, কড়াইল বস্তি, মহাখালী, বাড্ডা, শাহজাদপুর, খিলবাড়িরটেক, গুলশান ও বারিধারা এলাকার মাদক সরবরাহ করেন তারা। তাদের রয়েছে অতি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। যা ওই এলাকায় ‘মাদক সিন্ডিকেট’ নামে পরিচিত। বেশ কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তাও রয়েছেন তাদের সিন্ডিকেটে। এছাড়াও তাদের শতাধিক চ্যালার মধ্যে রয়েছে মামুন, নিরব, মফিজ, মোতালেব, ইয়াসিন, জুয়েল। প্রতিনিয়ত কলেজ পড়ুয়া নতুন নতুন যুবক যুক্ত হচ্ছে তাদের সিন্ডিকেটে। জড়িয়ে পড়ছে ভয়ানক মরণ ছোবলে আগ্রাসী মাদকাসক্তিতে। ধীরে ধীরে মাদক ব্যবসা থেকে শুরু করে অপরাধীতে রূপান্তরিত হচ্ছে। পরিবার থেকে হারিয়ে যাচেছ প্রিয় সন্তান।

মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকায় রয়েছে, আবদুল আলীর ছেলে শরীফ ওরফে পাগলা শরীফ। মহাখালী স্কুল রোডে নূরানী মসজিদের পাশের গলিতে নিজ বাড়ীতে শরীফের মাদক স্পট। একাধিক মামলার আসামি শরীফ বারবার পুলিশের হাতে গ্রেফতার হলেও জামিনে বের হয়ে আবার ইয়াবা-গাঁজা বিক্রি চালিয়ে যায়। মাদক ব্যবসায়ী শরীফ বনানী থানার এসআই আবু তাহেরকে ম্যানেজ করে মাদক ব্যবসা করেন। এ ছাড়া বনানী থানার পুলিশ সোর্স শহীদ তার স্পট থেকে সাপ্তাহিক চাঁদা আদায় করেন।

মহাখালী টিবিগেট এলাকায় ভয়ংকর ইয়াবা ব্যবসায়ী রকি। তিনি বনানী থানা পুলিশের সোর্স পরিচয়ে অতি দাপটের সাথে ইয়াবা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। রকি তল্লাশির অজুহাতে নিরীহ মানুষের পকেটে ইয়াবা ঢুকিয়ে দেয়। রকি উওর বাড্ডার গোপিবাগ এলাকার বাসিন্দা। তার নামে বাড্ডা থানায় ২টি মাদক মামলা ও মিথ্যা সাক্ষী দেওয়ার অভিযোগে ১টি মামলা রয়েছে।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ২০নং ওয়ার্ড কমিশনার কার্যালয় সংলগ্ন বুলুর বাড়ীর গাড়ি চালক কাশেম ইয়াবা ব্যবসায়ী। তিনি কড়াইলসহ ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় ইয়াবা সরবরাহ করেন। তাছাড়াও সে পুলিশের সোর্স কাজ করে।

বনানীর আলোচিত মাদক সম্রাট মালেক ওরফে জামাই মালেক। যার বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক মাদকের মামলা। মালেক সরকারি তিতুমীর কলেজের বিপরীত পাশের গলি ও আমতলী ২নং রোডে ইয়াবা এবং ফেনসিডিলের ব্যবসা করেন।

মহাখালী পশু গবেষণা প্রতিষ্ঠান সংলগ্ন মাদকের অন্যতম বড় নাটা ইউসুফের মাদকের স্পটে প্রকাশ্যে ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল বিক্রি করা হয়। তিনি ডিবির সোর্স হিসেবেও পরিচিত। তার নামে গুলশানসহ বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে।

মহাখালী ওয়্যারলেস গেট এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও ইয়াবার ডিলার মানিক ওরফে মহাখালী বাজারের তৃপ্তি হোটেল মানিক। তিনি পাঠাও চালকের ছদ্দবেশে ইয়াবা ব্যবসা করেন। গত বছরের মে মাসে ইয়াবাসহ বাড্ডা থানায় আটক করা হয় তাকে। বিপুল পরিমান মাদকসহ গ্রেফতারের পরও তিনি মাত্র দুমাস পরই জামিনে বের হয়ে ইয়াবা ব্যবসায় আবার সক্রিয়।

এদিকে বনানী থানার এসআই আবু তাহের ভূঁইয়া মাদকের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে আলোচিত। শুধু বনানীতে নয় গোটা ঢাকা শহরে রয়েছে তার শক্তিশালী মাদক ব্যবসায়ীদের নেটওয়ার্ক। তার সাথে আরও যাদের নাম বাংলা সংবাদের গোপন অনুসন্ধান দলের কাছে ওঠে আসে তারা হলেন, বনানী থানার এএসআই ওমর ফারুক ও কনস্টেবল শহীদ উল্লাহ। তারাই বনানীয় থানার এলাকার কয়েকটি স্পট সোর্স দিয়ে মাদক ব্যবসা পরিচালনা করেন।
সূত্র জানায়, ডিএমপির গোয়েন্দা প্রতিবেদনেও এসআই আবু তাহের মাদকের পৃষ্টপোষক হিসেবে ব্যাপক তথ্য রয়েছে।